৪০০ বছরে বদলে যাওয়া ঢাকার মহররম

প্রকাশ :
সংশোধিত :

ভোর পাঁচটায় বকশীবাজার এলাকা ঘিরে ফেলে পুলিশ। বোম্ব স্কোয়াডের কুকুর হাঁটে গলিতে গলিতে। ছাদে ছাদে বসে পাহারাদার, রাস্তার বাঁকে বাঁকে সিসিটিভি। বেলা বাড়লে হোসেনি দালানের ভেতর থেকে বের হয় তাজিয়া মিছিল, কালো পোশাক, 'হায় হোসেন' ধ্বনি, আর সেই ধ্বনির ঠিক পাশেই হাঁটে রাষ্ট্রের প্রহরা। দৃশ্যটা এখন এত গা-সওয়া যে কেউ আর ভাবে না, চারশো বছর আগে এই মিছিলের চেহারা আসলে কেমন ছিল।
সপ্তদশ শতকের ঢাকা। শাহ সুজার আমলে শিয়া প্রভাব বাড়ছিল রাজধানীতে, নায়েব নাজিমদের অনেকেই ছিলেন শিয়া পরিচয়ের। তাঁদেরই একজনের নৌ-সেনাপতি মীর মুরাদ ১৬৪২ সালে গড়ে তোলেন একটা তাজিয়া কোণা; ইটের ছোট্ট এক স্থাপনা, পরে যা প্রসারিত হয়ে রূপ পায় আজকের হোসেনি দালানে।
শুরুর সেই মহররম দশ দিনের বিস্তৃত আয়োজন। প্রতিটা দিনের ছিলো নিজস্ব নাম, নিজস্ব নিয়ম, নিজস্ব পোশাকের রং।
পাঁচ তারিখে সবুজ পোশাকের ভেস্তারা পথে নামতো। ছয় তারিখে লাঠিগুলো আড়াআড়ি রেখে, মোমবাতি জ্বালিয়ে এক রাত পার করা হতো ইমামবাড়ার চত্বরে।
সাত তারিখে সারা দালান আলোয় সাজিয়ে বের হতো আলম জুলুশ, সন্ধ্যা থেকেই বাজত মর্সিয়ার সুর।
আট তারিখ থেকে শুরু হতো মূল মিছিল, নামও বদলে যেত দিনে দিনে, তুগ গাস্ত, তারপর গাওহারা গাস্ত, শেষে মঞ্জিল গাস্ত। এই শেষ মিছিলটাকেই আজ আমরা চিনি, তাজিয়া মিছিল নামে।
১৮৫০ সালে কলকাতার এক পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে এই মিছিলের যে ছবি পাওয়া যায়, আজকের চোখে তা প্রায় অবিশ্বাস্য।
পতাকা হাতে শত শত মানুষ চক ঘিরে ঘুরে আসছে মসজিদের দিকে, সঙ্গে হাতি, ঘোড়া। নিশানবাহীদের পেছনে বাদকদল, তলোয়ার-লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে এগিয়ে চলা কসরতবাজদের সারি।
তারপর দুলদুল ঘোড়া, বিবির ডোলা, সবার পেছনে মর্সিয়ার সুরে বুক চাপড়ানো মানুষ।
মিছিল যেত হোসেনি দালান থেকে বকশীবাজার, উর্দু রোড, বেগমবাজার, চকবাজার ঘুরে আজিমপুরের কারবালা পর্যন্ত, শেষে লেকের পানিতে তাজিয়া বিসর্জন দিয়ে।
কবি শামসুর রাহমান তাঁর ছোটবেলার স্মৃতিতে লিখে গেছেন এই মিছিলের কথা।
নানির সঙ্গে চকবাজারের কোনো বাড়িতে গিয়ে রাতভর অপেক্ষা, বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে নানির গল্পে ডুবে থাকা, মিছিলের জন্য বসে বসে ঝিমিয়ে পড়া, আবার নানির ঝাঁকুনিতে ঘুম ভাঙা, ঠিক যখন মিছিল এসে পড়েছে সামনে। এই মিছিল কেবল আচার ছিল না, শহরের একটা সামাজিক উৎসবও ছিল। শিয়ারা উদ্যোক্তা, সুন্নিরাও অংশ নিতেন সহজেই, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। পথের ধারে বসতো মেলা, বিক্রি হতো খেলনা আর মিঠাই। ছেলেমেয়েরা সারা বছর তাকিয়ে থাকতো এই একটা রাতের অপেক্ষায়।
হোসেনি দালান একাই নয় এই গল্পে। পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জে আছে আরও পুরোনো একটা ঠিকানা, বিবি কা রওজা। হোসেনি দালানের চেয়েও এটা বয়সে বড়, ১৬০০ সালের দিকে তৈরি।
'বিবি' শব্দটা এখানে সম্ভ্রান্ত নারীর প্রতীক, স্থানীয়দের মুখে প্রচলিত বিশ্বাস বলে, এই রওজা হযরত ফাতিমার (রা.) স্মরণে গড়া।
জনৈক আমির খান স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই স্থাপনা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন, এমন গল্পও পাড়ায় পাড়ায় শোনা যায়। ইতিহাসের পাতায় এর সঠিক দলিল নেই, যা আছে তা মুখে মুখে চলে আসা স্মৃতি, তবু সেই স্মৃতিই বছরের পর বছর জায়গাটাকে ধরে রেখেছে মানুষের মনে।
মীর মুরাদের হোসেনি দালান গড়ার অনেক আগেই বিবি কা রওজা শহরের বুকে একা দাঁড়িয়ে আছে। ১৮৬১ সালে এক পার্সি এসে সংস্কার করেন জায়গাটা, কিন্তু আদি স্থাপনার চিহ্ন আজ প্রায় নেই। আশুরার দিনে এখান থেকেও তাজিয়া মিছিল বের হয়, তবে বেলা গড়িয়ে বিকেলের দিকে, হোসেনি দালানের সকালের মিছিলের চেয়ে অনেক পরে, আলাদা রাস্তা ধরে, গিয়ে মেলে ধানমন্ডির অস্থায়ী কারবালায়।
ইমামবাড়ার ভেতরে রাখা থাকে দুটো তাজিয়া, ইমাম হাসানের জন্য সবুজ গিলাফে ঢাকা একটি, ইমাম হোসেনের জন্য লাল গিলাফে আরেকটি। দেয়ালে ঝোলানো থাকে কারবালার মানচিত্র, ঢাল-তলোয়ারের প্রতিরূপ, যুদ্ধক্ষেত্রের কাল্পনিক ছবি।
ঢাকার বুকে আরও কিছু ইমামবাড়া ছড়িয়ে আছে। বড় কাটরা আর ছোট কাটরাও মোগল আমলের স্মৃতি বহন করে, যদিও হোসেনি দালানের জমকের পাশে তাদের নামডাক কম।
চকবাজারের ছোট কাটরায় প্রতিবেশী আর স্থানীয় শিয়া পরিবারগুলোকে নিয়ে বরাবরই হয়ে এসেছে ছোট পরিসরের আয়োজন।
মোহাম্মদপুরের চিত্রটা একটু আলাদা। এখানকার শিয়া মুসলিমদের একটি বড় অংশ বিহারি সম্প্রদায়ের, দেশভাগের পর থেকেই যাঁরা বসতি গড়েছেন এই এলাকায়।
মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্প আর সংলগ্ন শিয়া মসজিদ ঘিরে প্রতি বছর নিজস্ব তাজিয়া মিছিল হয়, হোসেনি দালানের মূল মিছিলের চেয়ে আলাদা পথে, আলাদা সময়ে।
মিরপুরের পল্লবী বিহারি ক্যাম্পেও চলে একই রকম আয়োজন, হোসেনি দালানের রীতি মেনেই, কিন্তু তাতে মিশে থাকে বিহার অঞ্চলের নিজস্ব সুরের মর্সিয়া।
লালবাগ আর পল্টনের দিকেও ছোট ছোট ইমামবাড়া আছে, যেখান থেকে আলাদা মিছিল বের হয়, জাতীয় দৃষ্টি সেগুলো তেমন আকর্ষণ করে না, সংবাদের শিরোনামেও আসে কম। তবু আশুরার সকালে এসব গলিতেও ওঠে সেই একই ধ্বনি।
ঢাকার মহররম তাই কোনো একটি কেন্দ্র থেকে চলে না। হোসেনি দালান প্রতীক হয়ে উঠেছে ঠিকই, গণমাধ্যমের ক্যামেরাও সেখানেই ভিড় করে বেশি। কিন্তু শহরের আরও অনেক গলিতে, অনেক পাড়ায়, একই শোক পালিত হয় নিজের নিয়মে, নিভৃততায়।
দশ দিনের সেই আয়োজন আজ এক দিনে এসে ঠেকেছে। হাতি-ঘোড়া নেই, মেলাও আগের মতো বসে না, মিছিলের রুট বাঁধা একটা পথে, হোসেনি দালান থেকে ধানমন্ডি লেকের ধারে প্রতীকী কারবালা পর্যন্ত।
মাতমের রীতিও পাল্টেছে। আগে ছুরি বা ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিজেকে রক্তাক্ত করা প্রকাশ্যেই দেখা যেত, এখন পুলিশ তা নিষিদ্ধ করেছে। মানুষ নিয়ম মেনেছে বটে, অভ্যাসটা পুরোপুরি ছাড়েনি, ছুরির জায়গায় এখন ব্লেড।
২০১৫ সালের ২৩ অক্টোবর রাতে আশুরার প্রস্তুতি চলার সময় হোসেনি দালান এলাকায় বোমা হামলা হয়। একজন মারা যান, আহত হন শতাধিক।
তাজিয়া মিছিলে এমন ঘটনা বাংলাদেশে আগে ঘটেনি। তারপর থেকে মহররম মানেই বিশাল আয়োজনের সতর্কতা, সিসি ক্যামেরা, ডগ স্কোয়াড, সাদা পোশাকের পুলিশ, ছাদে ছাদে চোখ। কয়েক বছর পর ইরান সরকারের সহায়তায় হোসেনি দালানের সংস্কার হয়, রঙিন কাচের পুরোনো নকশার জায়গায় বসে আয়াত-লেখা নীল টাইলস।
আজকের মিছিলে তরুণদের সংখ্যা বেশি, কালো পোশাকে, হাতে প্রতীকী ছুরি, আলাম, নিশান। তাদের ঘিরে থাকে এমন এক প্রহরা, যা আগের কোনো প্রজন্ম দেখেনি।
করোনার দুই বছর বন্ধ থাকার পর মিছিল যখন আবার পথে নামল, সেই প্রহরা সঙ্গেই ছিল, যেন শোক আর সতর্কতা এখন থেকে একসঙ্গেই হাঁটবে।
কারবালার ঘটনাটা একই রয়ে গেছে, ৬৮০ খ্রিস্টাব্দের সেই দিন ইতিহাসের পাতায় যেমন ছিল তেমনই আছে। বদলেছে শহর, আর শহরের রাস্তায় শোক প্রকাশের অনুমতি। হাতি-ঘোড়ার দীর্ঘ মিছিল থেকে আজকের সিসিটিভি-ঘেরা ছোট্ট পথ, অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে এই শোকযাত্রা। তবু যে রাতে মিছিল নামে, সেই রাতে এখনও কেউ একজন কেঁদে ওঠে পুরোনো সুরে, পাশের মানুষটাও বুক চাপড়ে নেয় সেই কান্না নিজের কাঁধে, ঠিক যেভাবে নিয়েছিল চারশো বছর আগে কেউ। হায় হোসেন, এই ডাকটা এখনও ফেরে প্রতি বছর, একই রাতে, একই কণ্ঠে, যেন সময় তাকে ভুলতে দেয়নি কখনও।
mahmudnewaz939@gmail.com


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.